শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৮ এএম
রেলের আরএনবিতে বদলি-পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
পছন্দের কর্মস্থল পেতে ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা লেনদেনের দাবি
আজগর আলী মানিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী—রেলওয়ে নিউক্লিয়ার/নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি)-তে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্যের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে যেতে কিংবা কোনো বদলি স্থগিত বা বাতিল করতে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে নানা তথ্য এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি।
বদলি কি এখন আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়?
আরএনবির কয়েকজন সদস্যের ভাষ্য, বাহিনীতে বদলি ও পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু কর্মস্থলে বদলি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ এবং আর্থিক সমঝোতার প্রয়োজন হয়।
কেউ কেউ দাবি করেছেন, নির্ধারিত বদলি ঠেকাতেও অর্থ লেনদেনের প্রস্তাব বা আলোচনা হয়েছে। তবে চাকরির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় অভিযোগকারীদের অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কয়েক দফায় বদলি নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আরএনবির বেশ কয়েকজন সদস্যকে বিভিন্ন দফায় বদলি করা হয়। ৫ জানুয়ারি তিনজন, ১৮ জানুয়ারি তিনজন, ২১ জানুয়ারি চারজন এবং ২৬ জানুয়ারি আরও চারজন সিপাহিকে বদলি করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, এসব বদলির কয়েকটি নিয়ে অর্থ লেনদেনের আলোচনা ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মস্থল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অঙ্কের কথা শোনা গেছে। যদিও এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কর্মস্থল পরিবর্তন
আরএনবির কয়েকজন সদস্যের বদলির সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের দাবি, সিপাহি সুমন দাশ গুপ্ত আরএনবির গোয়েন্দা শাখায় যোগদানের প্রায় ছয় মাসের মধ্যেই পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি হন।
অন্যদিকে মীর হোসাইনকে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১৪ জুন তাঁকে আবার লাকসামে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশনে যোগ দেওয়া আনন্দ বড়ুয়ার ক্ষেত্রেও এক বছরের কম সময়ের মধ্যে কর্মস্থল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ৯ জুন তাঁকে পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এসব বদলির প্রশাসনিক কারণ কী—এ নিয়েই বাহিনীর ভেতরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থ নেওয়ার পর ফেরত দেওয়ার অভিযোগ
শুধু বদলি নয়, চাকরি, পদোন্নতি, র্যাংক ব্যাজসহ বিভিন্ন সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়া এবং পরবর্তীতে তা ফেরত দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
মোমিন, বেলাল, আল-আমিন, ওয়াদুদ, তুহিন ও প্রশন্ন নামের কয়েকজনের কাছ থেকে কোনো এক পর্যায়ে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে চীফ কমান্ড্যান্টের দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ ফেরত ও বিষয়টি মীমাংসার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরএনবি চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একই বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কাছ থেকেও সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে খুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দিয়ে চায়ের দাওয়াতের কথা জানান।
ইন্সপেক্টরদের বদলি নিয়েও অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের আরও দাবি, পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে বদলি হয়ে আসা কয়েকজন ইন্সপেক্টরের ক্ষেত্রেও বদলি, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
পুরোনো অভিযোগও ফের আলোচনায়
মো. জহিরুল ইসলামকে ঘিরে বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন এবারই প্রথম উঠছে—এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তাঁদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করা হলে আরএনবির কিছু সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সে সময় কয়েকজন সদস্য পূর্বের আর্থিক লেনদেন বা পাওনা অর্থ ফেরতের দাবি করেছিলেন বলেও জানা যায়।
বর্তমান অভিযোগের সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের কিছু মিল থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
১৮৫ সিপাহি নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি মামলা
জহিরুল ইসলামকে ঘিরে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৮৫ সিপাহি নিয়োগের অনিয়মের মামলাটিও রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধানের পর ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই মামলায় তাঁকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে আসামি করা হয়।
অভিযোগ ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানোর মতো অনিয়ম করা হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ নিয়েও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
জহিরুল ইসলামের বদলি ঠেকাতে তাঁর ভাই আমিনুল ইসলাম সুজন রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করেছিলেন—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
তাঁদের দাবি, সুজন স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবহার করে জহিরুল ইসলামের বদলি ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ চাকরিজীবন
জহিরুল ইসলামের চাকরিজীবনের শুরু ১৯৯০ সালে সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম টাইপিস্ট পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে। পরে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পান। ২০০২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ২১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার হিসেবে সহকারী কমান্ড্যান্ট পদে যোগ দেন।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালে কমান্ড্যান্ট এবং ২০২০ সালে চীফ কমান্ড্যান্ট পদে দায়িত্ব পান।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য
আরএনবির সদস্যদের একটি অংশের প্রশ্ন—বদলি-পদায়ন, নিয়োগ ও অর্থ লেনদেন নিয়ে যদি একাধিক অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে না কেন?
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে যাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্ত হলে বদলি-পদায়ন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র যেমন পরিষ্কার হবে, তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিরাও অযথা অভিযোগের দায় থেকে মুক্তি পাবেন।
মিথ্যা মামলা থেকে জামিন পেলেন সোলাইমান রুবেল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ, জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্... বিস্তারিত
চাঁদাবাজদের হুমকির মুখে ব্যবসায়ী জীবন দেব নাথ ও তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুুমকি ১০ লাখ টাকা চাঁদ... বিস্তারিত
যমুনা ফিউচার পার্কে মোবাইল সার্ভিসিং নিয়ে অভিযোগ, ১৩ হাজার টাকার ভাউচার দিয়ে ২৬ হাজার টাকা দাবি ম... বিস্তারিত
বায়েজিদে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাঁদাবাজি-অপহরণের অভিযোগ: নেপথ্যে কারা? আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য... বিস্তারিত
পুরোনো মামলা ও ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচারের অভিযোগ অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা ... বিস্তারিত
বিনিয়োগের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় হালাল বিনিয়োগের নামে প্রতারণা এই প্রতারকে ধরিয়ে দিন... বিস্তারিত
মিথ্যা মামলা থেকে জামিন পেলেন সোলাইমান রুবেল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ, জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্... বিস্তারিত
চাঁদাবাজদের হুমকির মুখে ব্যবসায়ী জীবন দেব নাথ ও তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুুমকি ১০ লাখ টাকা চাঁদ... বিস্তারিত
যমুনা ফিউচার পার্কে মোবাইল সার্ভিসিং নিয়ে অভিযোগ, ১৩ হাজার টাকার ভাউচার দিয়ে ২৬ হাজার টাকা দাবি ম... বিস্তারিত
বায়েজিদে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাঁদাবাজি-অপহরণের অভিযোগ: নেপথ্যে কারা? আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য... বিস্তারিত