মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬ ০৭:১৯ এএম
রেলের টেন্ডার-ইজারা ঘিরে শাহ আলমের প্রভাবের অভিযোগ
স্ত্রীর নামে রেলভূমিতে রেস্টুরেন্ট, আইসফ্যাক্টরি রোডে মার্কেট নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
রিপোর্ট: আজগর আলি মানিক
চট্টগ্রাম রেলওয়ের টেন্ডার, ইজারা ও রেলভূমি ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এ সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে ঠিকাদার শাহ আলমের নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে টেন্ডার, ইজারা, জায়গা দখল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সবকটির বিষয়ে স্বাধীনভাবে
যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্রের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলমের নামে রেলভূমিতে ‘তাসফিয়া গার্ডেন’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশে, সিআরবি-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট রেলভূমির ওপর স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় শাহ আলম যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সক্রিয় উপস্থিতি এবং আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি রেলওয়ের বিভিন্ন কাজ ও ইজারা কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন টেন্ডার ও ইজারা কার্যক্রমে একচেটিয়া সুবিধা নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
স্ত্রীর নামে ‘তাসফিয়া গার্ডেন’
চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশে সিআরবি এলাকা সংলগ্ন রেলভূমিতে ‘তাসফিয়া গার্ডেন’ নামে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর স্থাপনাটি নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ইয়াসমিন আলমের নামে হলেও এর কার্যক্রম শাহ আলম নিয়ন্ত্রণ করেন বলে ৷ অভিযোগকারীদের দাবি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. জাফর হায়দার রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দেশের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই এলাকায় সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও রেস্টুরেন্টটি উচ্ছেদের সম্ভাবনা তৈরি হলে একটি পক্ষ এর বিরোধিতা করে। এমনকি লোকজন দিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
আইসফ্যাক্টরি রোডে এক বছরের ইজারা, গড়ে ওঠে বিশাল মার্কেট রেলওয়ের জায়গা ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নগরীর আইসফ্যাক্টরি রোডের ঘটনা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ দিকে রেলওয়ের কাছ থেকে এক বছরের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৩ একর জমি ইজারা নেওয়া হয়। আইসফ্যাক্টরি রোড ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড এবং চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে নেওয়া ওই ইজারার সঙ্গে শাহ আলমের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ৩৯ লাখ ১৮০ টাকায় ইজারা নেওয়া জমির আশপাশের আরও প্রায় ১ দশমিক ৬৮ একর জায়গা দখলে নিয়ে ‘শাহ আমানত রেলওয়ে সুপার মার্কেট’ নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মার্কেটটিতে প্রায় ২৭০টি দোকান তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। দোকানভেদে ১৫, ২০ ও ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলেও কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন। তবে শাহ আলম বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, রেলের ইজারার শর্ত মেনেই মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। এত বড় মার্কেট এককভাবে নির্মাণ করা সম্ভব নয় বলে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি নির্মাণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। এক বছরের ইজারার বিষয়টি ক্রেতাদের জানানো হয়েছিল এবং তারা জেনেশুনেই দোকান নিয়েছেন—এমন বক্তব্যও দিয়েছেন তিনি।
হোটেল, পার্কিং ও জলাশয় ইজারা নিয়েও প্রশ্ন
শাহ আলমের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম পুরোনো রেলওয়ে স্টেশনের হোটেল হেরিটেজ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটি ফ্লোর কম মূল্যে ইজারা নিয়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে বেশি দামে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চট্টগ্রাম নতুন রেলওয়ে স্টেশনের বড় একটি পার্কিং এলাকা ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হালিশহর এলাকায় রেলওয়ের প্রায় ১২ একর জমি ও জলাশয় ঘিরে বাগানবাড়ি নির্মাণের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
এ ছাড়া নতুন রেলওয়ে স্টেশনের বিভিন্ন দোকান এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার গেস্টহাউজ নিয়েও শাহ আলমের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
রেলওয়ের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ নিয়েও শাহ আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শাহ আলমের মালিকানাধীন এসএ করপোরেশন ও ইউনিক ট্রেডার্সসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ পেয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের আগের নির্মাণ অভিজ্ঞতা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে বড় অঙ্কের কাজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ পেতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। এর একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে এবং বাকি অংশ সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে যেত বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত প্রমাণের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুদকের তদন্ত ও মামলা
আইসফ্যাক্টরি রোডের জমি ইজারা এবং সেখানে মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগের মধ্যে জমি কম মূল্যে ইজারা দেওয়া এবং ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে।
এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন বলে জানা গেছে।
রেলের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এত বড় পরিসরে ইজারা, টেন্ডার ও রেলভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শাহ আলমের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো কাজ হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
চট্টগ্রাম রেলওয়ের টেন্ডার, ইজারা ও রেলভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে স্ত্রীর নামে রেলভূমিতে রেস্টুরেন্ট, স্বল্পমেয়াদি ইজারার জমিতে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের নতুন এমডি কমডোর ফজলার রহমান প্রেষণে নিয়োগ, প্রত্যাহার করা হলো বর্তমান ... বিস্তারিত
১৮ বিদ্যালয়ে শূন্য পাস! দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ১২৪ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য এসএসসি পরীক... বিস্তারিত
চট্টগ্রামে রাতে পতেঙ্গা ঘাটে এলো সাড়ে ৫ কোটি টাকার ইয়াবা ৫ কারবারি আটক হলেও মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার ব... বিস্তারিত
চসিকের কর্মকর্তা সেলিমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, দুদকে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিজস্ব প্রতি... বিস্তারিত
রাঙ্গুনিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও সরকারি সম্পদ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ: প্যানেল চেয়ারম্যান নজরুল ... বিস্তারিত
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আবাসিক ফ্ল্যাট সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সেলিম ভুঁইয়ার প্রত... বিস্তারিত
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের নতুন এমডি কমডোর ফজলার রহমান প্রেষণে নিয়োগ, প্রত্যাহার করা হলো বর্তমান ... বিস্তারিত
১৮ বিদ্যালয়ে শূন্য পাস! দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ১২৪ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য এসএসসি পরীক... বিস্তারিত
চট্টগ্রামে রাতে পতেঙ্গা ঘাটে এলো সাড়ে ৫ কোটি টাকার ইয়াবা ৫ কারবারি আটক হলেও মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার ব... বিস্তারিত
চসিকের কর্মকর্তা সেলিমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, দুদকে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিজস্ব প্রতি... বিস্তারিত